Sunday, January 6, 2008

অনুপ্রাস সম্বলিত একটি বিশেষ লেখা

অমাবশ্যার অন্ধকারে অসীম, অসহ্য অত্যাচার অগ্রাহ্য করিয়া নীলিমার নির্মল নীল নয়ন যুগলের আকর্ষণে আকুলভাবে আকৃষ্ট হইয়া আর একবার আসিয়া দরজার কড়ায় করাঘাত করিল। নীলিমা দরজা খুলিয়া নীল নয়ন যুগল তুলিয়া ব্যঘ্র তাড়িত সন্ত্রস্ত হরিণীর মত অসীমকে দেখিয়া অত্যাধিক অবাক হইয়া চাহিয়া রইল। এমনি অবস্থায় তাকে দেখিয়া এক্ষনে তাহার বুকের সমস্ত দরদ উদ্বেলিত হইয়া একত্রে কণ্ঠের বাহির হইতে চাহিলে কণ্ঠ পথের অক্ষমতায় অতিষ্ঠ হইয়া বাষ্পরুদ্ধ কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। অন্ধকার নিশির ঝড়ো-বৃষ্টির অত্যাচারে অত্যাচারিত অসীম অমনি অনড় ভাবে অঙ্কিত চিত্রের ন্যায় ঠায় দাঁড়াইয়া রহিল। কি যেন কহিতে চাহিয়া গভীর আবেগে উদ্বলিত উত্কণ্ঠায় ঠোঁট দুরি নড়িল মাত্র, মুখ ফুটিয়া কিছুই কহিতে পারিল না।
মনের মণিকোঠায় মর্মের যাতনাগুলি মহা বিক্ষোভে জ্বলিয়া পুড়িয়া প্রকাশের পথ না পাইয়া আঁখি বাহিয়া নীরব নীর হইয়া ঝরিতে লাগিল। অমনি ভাবে অনেক লগ্ন অতিবাহিত করিয়া দুই হাত বাড়াইয়া নীলিমা আশ্চর্য শান্ত অথচ করুন কণ্ঠে কহিল,- "অসীম আবার কেন আসিল?"
প্রতিত্তোরে অসীম ততোধিক শান্ত কিন্তু দৃঢ় কম্পিত কণ্ঠে কহিল, - "তোমার নয়ন আমায় ফিরিয়া ডাকিল, কিছুতেই যেতে দিল না যে।" জলে থৈ থৈ নয়ন দুটি নীলিমার নয়ন পানে রাখিয়া পুনরায় প্রশ্ন করিল,- "তুমিই বলো, যেতে না দিলে যাওয়া যায় কি?"
যাওয়া যে যায় না এই কথা নীলিমাও জানে। সে-ও কি চাহিয়াছিলো এমনি অকালে অসীমকে বিদায় জানাইতে। মননের মানুষ এমনটি কখনও মানিতে পারে না। তবু সমাজ নামের বিধাতার নিষ্ঠুর নিপিড়নে নিয়মের বাহুল্য আবরনে আবৃত হইয়া তাকে হৃদয় কাননে সদ্য প্রষ্ফুটিত পুষ্প কুঁড়িতে হুল ফুটাইতে হইল।
অসীম কহিল,-"নীলিমা, আমার নিয়তি আমাকে যে দন্ডই দিবে আমি তাহা নির্দিধায় গ্রহণ করিবো, তবু তুমি আমাকে তোমাকে ছেড়ে যেতে বলো না।" তাহার মুখের করুন কথা যতনা দরদের দাবিদার আঁখির চাহনি এতই করুন যে পাষাণও সেখানে দৃষ্টি পড়িবা মাত্র গলিয়া যাইতে বাধ্য। নীলিমাও সমস্ত বাধা, সমস্ত প্রতরোধের সর্ব প্রকার ভয় মুহুর্তে নির্দ্বিধায় ভুলিয়া গিয়া অসীমকে বুকে জড়াইয়া ঘরে তুলিয়া লইল। বাহিরে ঝড় আগের চেয়ে শতগুন প্রতাপে ধরনী কাঁপাইয়া বৃক্ষ রাজি ভাঙ্গিয়া-চুরিয়া ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া চলিয়াছে। নীলিমার বুকের মাঝে বেদনার ঝড় থামিল বটে কিন্তু তাহার পান্ডুর বদনে সমস্ত কলাগুলি তাহার জন্য যে পূর্বের চেয়ে শতগুন শক্তিধর সিডর অপেক্ষমান তাহারই পূর্বাভাস দিতেছে। অসীমকে খাটিয়ার কিনারে বসাইয়া নিজের ওড়না দিয়া ভিজা চুল মুছিঁয়া দিতে দিতে নীলিমা কহিল,- "অসীম, অযথা অত অত্যাচার, অপমান আর অপবাদের অমানিশা অতিক্রম করিয়া আমার কাছে কেন আসো? না আসিলেই পারিতে।" কথাগুলি শুনিয়া তাহার থৈ থৈ নয়ন হইতে জল ধারা ঝরিয়া পড়িল। জল ছল্ ছল্ নয়নে সে বলিল,- " নীলিমা, অপমানের অমানিশা কি তোমাকে হারানোর চাইতে অধিক কষ্টকর? আমার অন্তর জানে, জগতের যত যন্ত্রণা আমার কাছে অনেক তুচ্ছ।"
অনেক্ষণ নিরব থাকিয়া পূনঃ সে কহিল-
"নীলিমা, নিয়তির নির্মম নিষ্ঠুর নিরবচ্ছিন্ন নির্যাতন নিয়ে নিরবে নয়ন নীরে নিশি আর কত কাটাইব?"
"যতদিন পৃর্ণ মিলন না হইবে।"- নীলিমা বলিল।
"সেই মিলনের অপেক্ষায় থাকিয়া তুমি যে নিঃশেষ হইয়া যাইবে নীলিমা।"
শান্তি নয়ন দুটি তুলিয়া নির্মল ভঙ্গিতে নীলিমা কহিল- " নিঃশেষ যাহা হইবার তাহা আমারও নয় তোমারও নহে। হয়তো অন্য কাহারো। যাহা তোমার এবং আমার তাহা তো নিঃশেষ হইবার নয়, অসীম!" কথাগুলো কহিতে কহিতে নীলিমা বাষ্পরুদ্ধ কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। অসীম খাটিয়ার কিনার হইতে উঠিয়া গভীর আবেগে নীলিমার মাথা নিজের বুকের মাঝে টানিয়া লইল। তাহার হাতের ছোঁয়ায় নীলিমার দৃষ্টি কাড়িবার মত দীঘল কালো করবী বন্ধন মুক্ত হইয়া কটিদেশ স্পর্শ করিয়া সর্পিল গাতিতে নিন্মে নামিয়া গেল। চোখের জলে অসীমের বুকের বসন ভিজিয়া উঠিল। অসীম নীলিমার মাথা তাহার বুকের সাথে সজোরে চাপিয়া ধরিয়া মনে মনে ভাবিতে লাগিল বিধাতা যদি এমনি ভাবে সারাটা জনম অতিবাহিত করিবার সুযোগ দিত। মুখে বলিল- "কাঁদ নীলিমা কাঁদ। সমস্ত অনিয়ম, অত্যাচার, অদিন, অনাচারের অনুচ্ছেদ তোমার অনিবার আঁখি জলে ধূয়ে মূছে শেষ হয়ে যাক।" একান্ত সুখের আবেশে দুজন দুজনের বুকে কতটা বিমুতৃ সময় কাটালো

No comments: